Mrit-Pujarir Angane


॥ মৃৎ-পূজারীর অঙ্গনে ॥


সকল কাজের মাঝে শুনি তোমার আলোর বেণু,

পেঁজা মেঘের নীল আকাশে ছড়াও সোনার রেণু।

ঝিঁঝির কোরাস ভরা সাঁঝে প্রহর গোনার পালা,

খুশির ভোরের নরম ঘাসে শিউলি ঝরা মালা।

আকাশ কখনও আনমনা হয়, মুখভার করে মেঘে

মনের মাঝেও বৃষ্টি ঝরে, মন ভেজে তাকে দেখে।

হোক না আকাশ মেঘে ঢাকা, পড়ুক বৃষ্টি ঝিরিঝিরি

কাশের বন দিচ্ছে খবর, মা আসছেন শিগগিরই ।। 

দু'বছর আগে, ২০১৯ সালে আমাদের কলেজের বিভাগীয় অনুষ্ঠান শারদ অর্ঘ্যের জন্যে লিখেছিলাম এই কয়েক লাইন। এখন যেন এই লাইনগুলোই নিজেরা মুখভার করে আবেগের খুব গভীরে আঘাত হানছে! ২০২১-এ আবার লাইনগুলো লিখলাম'দশদিকে দশভুজা'-র নতুন এই অনুষঙ্গের নিরিখে। সকল কাজের মাঝে উঁকি দেওয়া অধীর অপেক্ষা আজকের পরিস্থিতির রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করতে পারছেন পুরোপুরি। যদিও নীল আকাশে পেঁজা মেঘ একই ভাবে খুশির উড়ানে পাড়ি দিচ্ছে আজও। শিউলিভরা উঠোন দেখছি প্রায় প্রত্যেক দিনই, তবে ভোরের খুশি কোথায় যেন মুখ লুকিয়েছে! তাই অবসাদের মেঘের বৃষ্টিতে মন ভিজতে বাধ্য। তবুও কাশের হিল্লোল আশার বাণীকে ফিকে হতে দিচ্ছেনা মোটেই। আর প্রত্যেকটা সন্ধ্যায় ঠিক যে জানালার পাশে বসে পুজোর কিছু পুরোনো স্মৃতি ভাগ করে নেওয়ার জন্যে কলম ধরা, সেই জানালার পাশের বাগানের গাছগাছালিতে ওই 'ঝিঁঝির কোরাস' যত রাত বাড়ছে ততই যেন প্রকট হয়ে উঠছে! এককথায়, পুজো আসার প্রিলিউডই বটে! সত্যি, এই কয়েকটা মাস ঘরবন্দি থাকতে থাকতে (হোক না সে এক প্রাসঙ্গিক ও প্রতিরক্ষামূলক কারণ) যেন পরবর্তীতে ভালো কিছু ঘটতেই পারে, এই আত্মবিশ্বাসটাই মাঝে মাঝে টলে যাচ্ছে। আর তার এই দোদুল্যমানতা অন্য কোনও কর্মকেন্দ্রিকতাকে ঘিরে না ঘটলেও, ঘটছে এমন আবেগকে ঘিরে যা কখনও আশা করিনি আমরা কেউই। পুজো কি গত বছরের মতই নিভৃতবাসে কাটবে? চূড়ান্ত আশঙ্কার মেঘ ঘনিয়েছিল কয়েক মাস আগেই।এখনকার এই 'নিউ নর্ম্যাল'-এর ভ্রুকুটি পুজোর ওপর কীভাবে শাসনের ছড়ি ঘোরাবে? এসবই এতদিন ছিল একটা ধোঁয়াশার মধ্যে। গতবছরের অনাড়ম্বর আয়োজন, কিছু ব্যানার এবং নানান জায়গায় প্রতিমা তৈরির তোড়জোড় দেখে মনের মধ্যে আবার পুরোনো আস্থার জায়গাটা একটু একটু করে ফিরে ধোঁয়াশার আস্তরণ কাটাচ্ছে। একটাই আপ্তবাক্য – সব স্বাভাবিক হোক, ছন্দে ফিরুক। 

  আমার পুজো দেখার অনাবিল আনন্দ যে কবে নিজের সংগ্রহের জন্য পুজো কভার করার একপ্রকার যান্ত্রিকতাতে পরিণত হয়েছিল, তা নিজেও বুঝতে পারিনি। জ্ঞান হওয়ার পর থেকে তমলুকের পুজোই দেখে এসেছি কখনও অন্য কোথাও না কাটিয়ে। তমলুকের পুজোর কথা বলতেই একটা কথা মাথায় এলো, অনেকেই হয়তো বলবেন তমলুক বিখ্যাত তার কালীপুজোর রোশনার জন্য, দুর্গাপুজোর জৌলুসের জন্য নয়। আমি কিন্তু এই ভাবনার ঘোর বিরোধী! হোক না দীপাবলিকে ঘিরে বিশেষ আকর্ষণের রমরমা, তা বলে ছোট-বড় অন্তত চল্লিশটা দুর্গাপুজো যে শহরে হয়, তার টানকে কি এত সহজে অস্বীকার করা যায়? আমার কাছে তাই তমলুকের কালীপুজোর চেয়ে দুর্গাপুজোর টান অনেকটাই বেশি। ২০১২ থেকে যখন একটু একটু করে ছবি তোলা শুরু করি, মোটামুটি তখন থেকেই পুজো দেখার চেয়ে পুজো কভার করার নেশাটা মাথায় বেশ জাঁকিয়ে বসতে থাকে। নতুন কোনও জায়গার ভালো প্রতিমার খবর পেলেই যখন যার সাথে সম্ভব হতো, বেরিয়ে পড়তাম নির্দিষ্ট কোনও দিন দেখে। তবে এই জেদটা যে একদম ছবি তোলার প্রতি ভালোবাসা বাড়ার সাথে সাথেই জন্মেছিল তা নয়, এমনি ঠাকুর দেখার আনন্দেও প্রচুর ঘুরেছি, গেছি একাধিক জায়গায়। '১২-র কথাটা বললাম কারণ পুজো কাটানোর প্রতিবছরের রুটিনের পরিবর্তে ওই বছরটা ছিল একটা মাইলফলক! পরিচয় করার সুযোগ এলো রাজ্যপালের কাছ থেকে স্পেশ্যাল ক্রেডিটস্ অন আর্ট অ্যাণ্ড ক্র্যাফটের বিশেষ সম্মানে ভূষিত এক আন্তরিক প্রতিমা শিল্পীর সঙ্গে, নাম- ক্ষুদিরাম সামন্ত। আমার কাছে ক্ষুদিরাম জেঠু। আজ মহালয়ার সকালে যখন পুজোর রেশে নিজেকে সাজিয়ে নিচ্ছে শহর, গ্রাম ও শহরতলি, যে যার সবটুকু সত্তা উজাড় করে সেরাটুকু উপস্থাপনা করতে প্রস্তুত, যাঁদের জন্যে দুর্গাপুজোর আকরকে আমরা অনুভব করতে পারি, তাঁদের কয়েকজনের কথা আজকের সকালে না বললে বিরাট একটা শূন্যস্থান রয়ে যাবে আমার নিজের মনেই।  ক্ষুদিরাম জেঠুর কথা প্রথমেই মাথায় আসতে বাধ্য কারণ বিগত আট বছর ধরে পুজোর এই প্রস্তুতিমূলক দিনগুলোয় আমি ওঁর বাড়িতেই সবচেয়ে বেশি সময় কাটিয়ে এসেছি। দেখেছি একের পর এক মন ভালো করে দেওয়া কাজের নৈপুণ্য আর তুলেছি অগুনতি ছবি। যদিও জেঠুর কাজ আমি প্রথম দেখি ২০০৯ সালে আমার স্টপেজ নিমতৌড়ী থেকে মাত্র দু'কিলোমিটার দূরের সাওতানচক বলে একটি জায়গার কসমস নামের একটি ক্লাবের সার্বজনীন পুজোয়, ওঁর সঙ্গে পরিচয় আমার ২০১২ য় তমলুকের একটি প্রতিমাকে কেন্দ্র করে। অবশ্যই তাঁরই কাজ। সে কথায় আসছি। কসমসের ওই চোখ ধাঁধানো মাতৃমূর্তি, প্রবল পরাক্রমে নিজের ডান হাত দিয়ে সিংহকে প্রায় পরাভূত করে ফেলা দৃপ্ত মহিষাসুর আর প্রতিমার ব্যাকগ্রাউন্ড হিসেবে অস্তগামী সূর্যের ছটায় লাল আকাশের নিচে দেবাসুরের প্রবল সংগ্রামের সেই ক্যানভাস পেইন্টিং- আহ্! ভীষণ আপশোস করি এখন পেইন্টিংটা আজ নষ্ট হয়ে গেছে বলে! কী কাজ দেখেছিলাম সেদিন! আমার একটা ঢং ছিল ভালো পুজোর কথা শুনলে সেই মণ্ডপের কাছাকাছি পৌঁছে ঢোকার কয়েক সেকেণ্ড আগে ইচ্ছে করে চোখ বন্ধ করে নিতাম চমকটা দু'চোখ ভরে উপভোগ করবো বলে। সেবার কসমসের পুজোর ক্ষেত্রেও ঠিক তাই হয়েছিল। যাকে বলে চক্ষু সার্থক করা। সেই থেকে এই মানুষটির কাজের গুণমুগ্ধ হওয়া শুরু। 

  যাই হোক, '১২-র সেই ঘটনায় আসি। তমলুকের মালিজঙ্গলপল্লীর কমেট ক্লাবে সেবছর জেঠুর কাজ। তিনটি নৌকোয় দুর্গা-অসুর-সিংহ, কার্তিক-সরস্বতী ও লক্ষ্মী-গণেশের আলাদা আলাদা কাঠামোয় অবতারণা। আর ক্লাবটা হলো তমলুকের কল্পনাবিলাসী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে একটা। এক সদস্য বললেন, মায়ের স্বপ্নাদেশেই এই মূর্তি তৈরি করানো হয়ছে (নামটাও মনে আছে, বললামনা)। মাথাটা গেল হালকা গরম হয়ে। ঠিক করে ফেললাম, স্বয়ং রূপকারের কাছে এসব গল্পের গোরুর গাছে ওঠা না জানালেই নয়! অষ্টমীর দিন আমি এবং সমরেশ (সমরেশ সিংহ, বাল্যবন্ধু ও অনেক বছর আমরা একসাথে বেরিয়েছি- ঠাকুর দেখতে ও পরে কভার করতে) ওই কসমস থেকেই জেঠুর ঠিকানা জোগাড় করে বেরিয়ে পড়লাম। আমাদের কাছে এসব তখন অ্যাডভেঞ্চার! পৌঁছলাম ওঁর বাড়িতে। সদ্য দুর্গারা পাড়ি জমিয়েছে নির্দিষ্ট মণ্ডপে। শিল্পীর উঠোনে তাই এই অব্যক্ত রিক্ততা। বেঁটেখাটো ফর্সা চেহারার রোগা গড়নের মানুষটি কিছু একটা প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন পরের কোনও কাজের জন্য। এগিয়ে এলেন। পরিচয় করলাম ও কমেটের স্বপ্নবিলাসিতা শোনালাম। "দূর! দূর! সুবলবাবুর [ভাস্কর সুবল পাল] একটা কাজ ও'রম এক রঙের ধাঁচে হয়েছিল পুরো মাটির সাজসজ্জায়! ওইটার ছবি নিয়ে এসে আমায় দেখালো আর সুবলবাবুর কাজ আমার নিজেরও যথেষ্ট পছন্দের। তাই এ অপশন ছাড়া যাবেনা বলে কাজটা নিয়েই ফেললাম। তোমায় এইসব বলেছে নাকি স্বপ্নটপ্ন দেখেছে বলে?" বলে একগাল হাসি। পরিচয়ের প্রাথমিক পর্বের পর আমার পরিচিতি জিজ্ঞেস করায় যখন বললাম বাবার কথা, উনি চমকে উঠলেন। "তুমি বুদ্ধদেবের ছেলে! আগে বলবে তো!" আসলে বাবা ছিলেন ওঁর অন্তরঙ্গ বন্ধু। প্রথাগত কর্মকেন্দ্রিক জীবনের চৌহদ্দি পেরিয়ে যখন বাবা শিল্পচর্চাকেই পেশা করে ফেলেছেন, ওঁর সাথে পরিচয় ঘটে অনেক শিল্পানুরাগীরই। ক্ষুদিরাম জেঠু জানান, তাঁর জন্যে বাবা হাতে লিখে ও ডিজিট্যাল মাধ্যমে অনেক লেটারিংয়ের কাজ করেছেন দীর্ঘ সময় ধরে। ব্যস্। সেই থেকে আমার সাথে জেঠুর পরিচয়টা আর শুধু শিল্পী আর অনুরাগীর রইলোনা। দানা বাঁধলো আত্মীয়তা। উনি এবং জেঠিমা দু'জনেই আমায় কোনওদিন নাম ধরে ডাকেননি, সবসময় ডেকে এসেছেন ও আজও ডাকেন 'জেঠু' বলেই। এরপর একের পর এক অনবদ্য শিল্প-রূপায়ণের সাক্ষী থেকেছি। ক্ষুদিরাম জেঠুর বাড়িতেই এর পরের বছর পরিচয় হয় ওঁর এক সহকর্মীর সাথে- শ্যামপদ পাল। শ্যামকাকু কুমোরটুলির সুধীর পালের কাছে তালিম নেওয়া দোমেটের কাজের এক অনন্য শিল্পী। বিশেষ দক্ষতা সিংহ আর মহিষের রূপদানে, যা নিঃসন্দেহে আমার প্রিয় বিষয়। একবার একটি প্রতিমার সিংহে ইনসাইজার (বা কৃন্তক) দাঁত ছ'টির পরিবর্তে চারটি দেখে শ্যামকাকুকে বলেছিলাম দু'টো কি জায়গা করে বাড়ানো যায়না? ছবি দেখালাম। উনি খুশি হয়ে সেই যে সেদিন বলেছিলেন "এ যা দেখলাম পরে আর কখনও একচুলও ভুলবোনা," সত্যিই এরপর ওঁর কোনও কাজে সিংহের দাঁতের সংখ্যায় আর হেরফের হয়নি কোনওদিনই, তা সে ক্ষুদিরাম জেঠুর প্রতিমায় ওঁর কাজ হোক বা অন্য যে কোনও প্রতিমাশিল্পীর কাজে। 

  কুমোরটুলির মতোই জেলার শহরতলির শিল্পীরা অনেকেই যে যার নির্দিষ্ট এরিয়া অব্ ইনটারেস্টের ভিত্তিতে কাজ করেন। কেউ দোমেটেতে দাপুটে, কেউ রং আর সজ্জায়। প্রত্যেকের ভূমিকা প্রতিমার এক একটা অংশকে ঘিরে। তেমনই আর এক দোমোটের কারিগরকে দেখেছিলাম, গোরাচাঁদ পণ্ডা। তমলুকে দীর্ঘদিন কাজ করা এই শিল্পী নিজের জীবনের তরুণ পর্বে কাজ করেছেন ক্ষুদিরাম জেঠুর সহকর্মী হিসেবেই। পরে ওঁর সাহচর্যে শিল্পমণ্ডিত হয় এখানকার বড় বড় অনেক শিল্পীর কাজই। গোরাচাঁদবাবুর কাজের ছোঁয়া সবচেয়ে বেশি যাঁর কাজে ছোটোবেলায় দেখতাম, তিনি বুড়ারির (তমলুক থেকে মেচেদা যাওয়ার আগে বুড়ারি বাস স্টপেজ) পুলীন বিহারী মাইতি। ওঁর কথায় আসছি পরে। ২০১৩-র এক বিকেল। তখন স্কুল থেকে ফিরে ফ্রেশ হয়েই ছুটতাম পুজোর কাজ দেখার জন্যে টো-টো করতে। তেমনই একদিন চলে গেছি গণপতিনগর শারদীয়া কমিটির প্রাঙ্গণে। সেখানে বহাল তবিয়তে কাজে বহাল এখানকার প্রবীণ প্রজন্মের তাবড় শিল্পী নারায়ণ চন্দ্র পড়িয়া। তমলুক সাব্-ডিভিশন ও নিমতৌড়ী এলাকার অনেক পুজোর সাথে নারায়ণ জেঠুর নাম ছিল অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। গুরুদেব বনমালী বেরার সুনিপুণ কাজের প্রতিটি আঙ্গিক রন্ধ্রে রন্ধ্রে বয়ে নিয়ে চলতেন নারায়ণ জেঠু, এখন বয়সের ভারে ও সহকর্মীর অভাবে পেরে ওঠেননা আর। সেবার গণপতিনগরে নারায়ণ জেঠুর প্রতিমার মাটির ডিটেলিং করছেন গোরাচাঁদবাবু। হঠাৎ এলো এক বিপত্তি! বনবন করে সাইকেল নিয়ে সেই প্রাঙ্গণে হাজির স্বয়ং ক্ষুদিরাম জেঠু! এসেই চার্জ গোরাচাঁদবাবুকে! কথাবার্তা অনেকটা এইরকম — 

– "গোরা, এতদিন ফোন করে করে হন্যে হয়ে ঘুরছি আ তুই এখানে এত কাছে থেকেও একটা কল ব্যাক করে জানানোর প্রয়োজন মনে করলিনা।" 

– "কী করবো ক্ষুদিদা! দেখতেই তো পাচ্ছো কীভাবে ব্যস্ত হয়ে পড়েছি। তুমি... তুমি চিন্তা কোরোনা, দু-একদিনের মধ্যে যাচ্ছি।" 

– "চিন্তায় ফেলে রাখলে চিন্তা করবোনা? গত তিন সপ্তাহে বার পাঁচেক কল করছি। একবার বৌমা ধরেছিল। বললো ও তো পাশের দোকানে একটু গেছে। আসলেই করতে বলছি। সে তোর এসে আর ফোন করা তো হলোই না!"

গোরাচাঁদবাবু ইতস্তত করলেন। ক্ষুদিরাম জেঠুর আবার চার্জ- "তুই বাড়িতে থেকেই ঢপ ঝেড়েছিস।" 

– "এ বাবা! কী যে বলো?" 

– "অথবা অন্য কোথাও গিয়ে কারচুপি করে বলতে বলেছিস বাড়িতেই আছিস বলে।" 

আবার ওঁর ইতস্তত দেখে জেঠু এবার ধাঁ করে কল করে বসলেন গোরাচাঁদবাবুর স্ত্রীর ফোনে। 

– "হ্যাঁ, বৌমা, ক্ষুদিদা বলছিলাম।" 

– "হ্যাঁ হ্যাঁ দাদা, বলুন বলুন!" 

– "বলছি শোনোনা, সেবার তো গোরার সাথে কথা হলোনা। একটু ফোনটা দাওনা। তারিখের ব্যাপারে কথা বলতাম। সময় যত এগোচ্ছে চাপও তো বাড়ছে বুঝতেই পারছো।" 

– "ক্ষুদিদা আপনি একটু দাঁড়ান, ও পাশের দোকানেই পান আনতে গেছে। আসুক, আমি বলছি।" 

"বেশ" বলে ক্ষুদিরাম জেঠু ফোন রেখে যে দৃষ্টি হানলেন গোরাচাঁদবাবুর ওপর (তারপর যা শব্দপ্রয়োগ আর প্রবাদ প্রয়োগ করলেন, সে আর লেখার মতো নয়), তা দেখে ওঁর কী অবস্থা হয়েছিল জানিনা, কোথায় দমফাটা হাসি লুকোবো, তা ছিল আমার খোঁজার সাধ্যের বাইরে। যাই হোক, বিবাদভঞ্জন করলেন স্বয়ং নারায়ণ জেঠুই। নিজের কাজ শেষ হওয়ার দু'দিনের মধ্যেই গোরাচাঁদবাবুকে পাঠালেন ক্ষুদিরাম জেঠুর কাজের জন্যে। 

  নারায়ণ জেঠুও বাবার অতি পরিচিত একজনই। আমাদের বাড়ির সরস্বতী পুজোয় ওঁর প্রতিমা আসতো আগে। জেঠুর যে কাজ আমার প্রথম চোখ টেনেছিল তা ছিল ২০০১ সালের। তমলুকের দ্বিতীয় প্রাচীনতম পুজো রামসীতাবাজার সার্বজনীন দুর্গোৎসব কমিটির প্রতিমা। রক্তাক্ত বুকে মহিষাসুর একপ্রকার ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি ভঙ্গিতে পলায়মান, পেছনেই দেবীকে পিঠে নিয়ে ধাবমান সিংহ। সিংহকে আবার পেছন থেকে বাধা দিচ্ছেন মহিষাসুরের আর এক রেপ্লিকা! বেশ মনে পড়ে, দাদুনকে জিজ্ঞেস করেছিলাম ত্রিশূল তো বুকে বেঁধেইনি! তাহলে রক্ত এলো কীকরে? দাদুন বুঝিয়েছিলেন, "মা বোধ হয় ত্রিশূল মেরেই আবার তুলে নিয়েছেন সতর্ক করবার জন্যে।" পরে ২০০৭ থেকে যখন এখানকার পুজো দেখতে আরম্ভ করি, নিমতৌড়ীর মিনি মার্কেট কমপ্লেক্সের ক্যাম্পাসের পাশে উনি সারে সারে তৈরি করতেন এখানকার বেশ কিছু নামী পুজোর প্রতিমা। ওঁর কাজের বিশেষত্ব ছিল মায়ের টানা টানা (একচালার কৃষ্ণনগরী ঘরানার টানা চোখ নয়) দীপ্ত চোখ, চূড়ান্ত আত্মম্ভরী চাহনির পেশিবহুল মহিষাসুর (বস্তুত, অনেক প্রথিতযশা শিল্পীই বাংলার প্রতিমা গড়ার অনাদিকালীন রীতি- অশুভ শক্তির ক্ষুদ্রায়তনিক প্রকাশ, অর্থাৎ অসুরের দৈহিক গড়ন দেবতাদের চেয়ে গড়পড়তা ছোট রাখার এই নিয়মকে অনুসরণ করলেও নারায়ণ জেঠু নিজের কাজে তেমন নিয়মকে তোয়াক্কা করেননি কোনওদিনই), যাকে এখনকার প্রতিশব্দে বললে বলা উচিৎ 'হ্যাণ্ডসাম হাল্ক' আর সাদা সিংহ (সত্যিকারে white lion বা Panthera leo krugeri মাথায় রেখে করতেন কি না তা অবশ্য জানিনা)। সম্প্রতি 'ভোকাট্টা' নামের একটি কিশোর সাহিত্য পত্রিকার (ই-ম্যাগাজিন) জন্যে লিখলাম প্রবাদ প্রতিম ভাস্কর গোপেশ্বর পালের শিল্পচর্চা ও অবদান নিয়ে একটি প্রবন্ধ। সেখানে গোপেশ্বরবাবু কীভাবে সিংহের লোমের বুনন ফুটিয়ে তোলবার জন্যে টার্কিশ তোয়ালে ব্যবহার করতেন তা বলেছি। নারায়ণ জেঠু সেই সাদা তোয়ালের ওপর বড়জোড় বাদামী-ধূসর গুঁড়ো রঙের ব্যবহারের শেড ফুটিয়ে তুলতেন (এই পদ্ধতিরই অধঃপতন হয় এখনকার সহকর্মীদের দোষে ২০১২-১৩ থেকে, হলদিয়ার পুরোনো এক সহকর্মীর ওঁর স্টুডিও থেকে চলে যাওয়ার পর)। ব্যস্, এর বেশি আর কিছু নয়। সেই সঙ্গে মানানসই পাঁশুটে-সাদা পাটের কেশর। মনে পড়ে, একজন আঁকার শিক্ষক একবার ওঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে বডি বিল্ডারের মতো দেহসৌষ্ঠবের অসুরের তুলনায় এত ছোট মুখ? উনি বলেছিলেন, "বডি বিল্ডারদের মধ্যে ক'জন মুখের এক্সারসাইজ করে মুখকে বড়সড় করেছেন শুনি?" ছোট্ট এবং সংযত ব্যাখ্যা। '১২-র পুজোর চতুর্থীর সন্ধ্যায় এক দাদার সাথে সময় কাটাচ্ছি এখানকার তুলনামূলক 'সিনিয়র' পুজো নিমতৌড়ী গ্রামবাসী ও ব্যবসায়ীবৃন্দের পুজোমণ্ডপে। কাজ প্রায় শেষ সামান্য কিছু সাজগোজ ছাড়া আর এদিকে এক ভদ্রলোক অনেকক্ষণ ধরে বলে চলেছেন চক্ষুদান বাকি! জেঠুকে জিজ্ঞেস করলাম যে আদৌ কিছু বাকি কি না। একটা ছোট লাঠির মাপের বাঁশের টুকরোকে মসৃণ করতে করতে ওঁর অস্পষ্ট উত্তর, "না।" 

– "তবে উনি যে বলছেন চক্ষুদান নাকি এখনও শেষ হয়নি?" 

– "না, না।" 

বুঝলামনা, বুঝে উঠতে যাচ্ছি, এমন সময়- "বাপি, (উনি আমায় এই নামেই ডাকেন) কোন লোকটা এখানে কী যেন বকবক করছিল?" ঈশারা করে দেখালাম। পলকের মধ্যেই ছোট বাঁশটা ত্রিশূলের মতো করে রণরঙ্গিনী ভঙ্গিমায় ধরে সেই ভদ্রলোকের কাছে (ওঁর চেনা অবশ্যই) একপ্রকার লাফিয়ে পড়ে, "এই লোকটা? এটাকে এইইইই ভাবে ত্রিশূল দিয়ে মারা উচিৎ সেটা তোমরা কি জানোনা?" গোটা মণ্ডপের মধ্যে থাকা লোকজন চমকে উঠলো আর তারপর হো হো করে হাসির কল্লোল! 

  নারায়ণ জেঠুর কাজ খুব কাছ থেকে দেখা আরম্ভ করি ২০০৯ থেকে ওই মার্কেট কমপ্লেক্সের ক্যাম্পাসেই। চোখ আঁকার এক অনবদ্য পদ্ধতি নিরীক্ষণ করতাম বেশ কয়েক মিনিট ধরে। প্রথমে বেস্ লাইন তুলির রেখায় ফুটিয়ে তোলার পর চোখের প্রতিটি পাতার শুরু করতেন চোখের কোণের সেই বিন্দু থেকেই যেখান থেকে বেস্ লাইন শুরু করেছিলেন। তারপর যা ঘটতো সেটা কোনও চমকের চেয়ে কম নয়। বনমালীবাবুর প্রতিমার মুখের ছাঁচ থেকে মুখ তৈরি করে নানান রকমের অভিব্যক্তির সংযোজন ঘটাতেন নিজের মতো করে। তবে ওঁর গড়া প্রতিমার যে প্রভাবটা আমার ওপর ছোটবেলায় সবচেয়ে বেশি ও মারাত্মকভাবে পড়তো তা হলো ওঁর মহিষাসুর! প্রমাণ চেহারার সুনিপুণ দেহসৌষ্ঠবের সাথে মাননসই গোঁফের রসায়ন বেশ কয়েক বছর ধরে আমাকে এতটাই অসাড় করে রাখতো যে এই অভিব্যক্তিকে সঠিক শব্দে বাঁধাও মুশকিল! অষ্টমী ও নবমীর সন্ধ্যেবেলা আমরা বেরোতাম ঠাকুর দেখতে। ওই দু'দিন ছাড়া বেরোনো হতোনা। বাড়িতে অন্যান্য দিনগুলোয় আত্মীয়-পরিজনেরা আসতেন। তাই অষ্টমী-নবমীর রাত ছিল আমাদের পুজোর ক্লাইম্যাক্স। আর কী যাচ্ছেতাই ই না কাটতো এসে! ঠিকমতো খেতে ইচ্ছে করতোনা এতটাই সিঁটিয়ে থাকতাম। ঘুম তো আসতোই না। ঘুম আসতোনা সেই ভীষণদর্শনের প্রভাবে। তবে এখন, কেন জানি না, ভীষণভাবে মনে হয় সেই প্রভাব ভয়ের কারণে ছিলনা! ভয় যদি হতো তাহলে তো এমন আসুরিক প্রতিমূর্তিকে কল্পনাতেও ঠাঁই দিতে মনে বাধতো (যেমন এখনও নির্জন অন্ধকারে ভৌতিক কিছু ভাবতে ইচ্ছেই করেনা, এটা কিন্তু ভয়েই)। কিন্তু নারায়ণ জেঠুর এবং ওঁর সমসাময়িক বেশ কিছুজনের মহিষাসুর একটা অদ্ভূত বিস্ময়ের সঞ্চার করতো! ভাবতে ইচ্ছে হতো বার বার, কীভাবে একা একজন এত বলশালিনী দশায়ূধধারী প্রতিপক্ষের সামনে লড়ে যাচ্ছেন! চোখে দেখা নানান দৃশ্য মিলেমিশে তৈরি হতো এক ঐন্দ্রজালিক বাতাবরণ! যে কমেট ক্লাবের পুজোর কথা শুরুতে বলছিলাম, সেই ক্যাম্পাসের বিপরীতের রাস্তাটা গিয়ে উঠেছে তমলুকের বর্গভীমা মন্দির পাড়ায়। সেদিক থেকে এলে একদম বড়ো রাস্তার ওপরেই মণ্ডপ, যাওয়া-আসার পথের একদম পাশেই। জেলখানা মোড় থেকে আসতে পুজোমণ্ডপ পেরিয়েই ডান দিকে পড়ে দে পাড়ার বিখ্যাত নটীবয় ক্লাবের পুজো (এখানকার ২০০৪ সালের প্রতিমা ছিল ক্ষুদিরাম জেঠুর, তমলুকের বুকে দ্বিতীয়বার সম্পূর্ণ মাটির কাজ। তিন মহিষাসুরের সাথে দেবীর যুদ্ধের সেই প্রতিচ্ছবি আর কার্তিক-গণেশের যুযুধান অবস্থানকে দাদুন সম্পৃক্ত করেছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গান "মা গো ভাবনা কেন?/আমরা তোমার শান্তিপ্রিয় শান্ত ছেলে।/ তবু শত্রু এলে অস্ত্র হাতে ধরতে জানি,/তোমার ভয় নেই মা, আমরা প্রতিবাদ করতে জানি"-র আবহের সাথে, প্যাণ্ডেলে বাজছিল তখন শ্রীকান্ত আচার্যের ভার্সনটা) ওখানকার একটি বাড়িতে ভাড়ায় থাকতাম ২০০৪ সালে। ওই বছরটা আর পরের দু'টো বছরও যেখানে থাকতাম, নটীবয়ের মণ্ডপ পেরিয়ে রাস্তায় উঠে অনিবার্যভাবেই কমেটের পুজো দেখে তারপর এগোতে হতো। প্রতি বছর অষ্টমীর সন্ধ্যারতি অথবা সন্ধিপুজোর সময় উন্মত্ত ঢাকের আওয়াজ আর ধুনুচি নাচ ছিল প্রত্যেক বছরেই চোখে পড়ার বিষয়। ২০০৫ থেকে তখন নিয়মিতভাবে কমেটের কাজ করে আসছেন পুলীনবাবু। ওঁর মহিষাসুর নারায়ণ জেঠুর মহিষাসুরের মতো অত বড়ো চেহারার আর গৌরবর্ণ হতোনা। একটু চাপা শ্যামবর্ণের সাথে খুব হালকা বাদামীরঙা চুলের কম্বিনেশন ছিল পুলীনবাবুর কাজের ছাপ। সেইসঙ্গে কমেটের প্রতি বছরের আকর্ষণ, শোলার কাজের ডাকের সাজ। কী বলবো? ঢাকের বোল, ধুনুচির ধোঁয়া আর ওই শ্যামবর্ণের ওপর শ্বেতশুভ্র সাজসজ্জার জাঁদরেল অসুরের মূর্তির যে চোখ ধাঁধানো মেলবন্ধনটা দৃশ্যে ফুটে উঠতো, তার অনুভূতিই ছিল স্বতন্ত্র! যেন যুদ্ধ বেধেছে সত্যি সত্যি! আর এই দৃশ্য কমেট ছাড়া অন্য পুজোয় ছিল বিরল! সব নিয়ম রীতিই পালন করা হতো সব জায়গায় কিন্তু কমেটে ভিস্যুয়াল ইমপ্যাক্টের জায়গাটা ছিল ভীষণ জোরদার। 

  সিংহের সাথে তো সখ্যতা আমার বহু পুরোনো। অরণ্যপ্রেমী আর ব্যাঘ্রপ্রেমী (শুধু বাঘ বোঝাতে ব্যবহার করলামনা শব্দটা, 'বিগ ক্যাট' বোঝাতে এর চেয়ে বেশি উপযুক্ত শব্দ আর পেলামনা) হওয়ার দরুণ আজ এই সখ্যতার একটা স্থায়ী ভিত্তি জন্মেছে চর্চার মাধ্যমে। কিন্তু সেই আকর্ষণ আজও অমলিন। আমার তো সিংহের জন্যেই ভয় লাগতো যে বেচারা মহিষাসুরের সাথে যুদ্ধে যেন হেরে না যায়। পাঁশকুড়া বাসস্ট্যাণ্ডের বিপরীতে মিলন মেডিক্যালের দোতলায় ভাড়ায় থাকতাম ১৯৯৯-এর গোড়া থেকে থেকে ২০০৪-এর মার্চ অবধি। বাড়ির সামনে দিয়ে যেত একাধিক নিরঞ্জনযাত্রা। বারান্দা থেকে দেখতাম এক মনে। আসলের অষ্টমীর সন্ধ্যেটা পেরিয়ে গেলেই মনখারাপ হয়ে যেত। ভীষণ মনখারাপ। মা চলে যাচ্ছেন, আবার আসবেন এক বছর পর! এতদিনের প্রতীক্ষা! নিরঞ্জন শোভাযাত্রা দেখার সময় একটু অস্থির হয়ে ঝুঁকে দেখার চেষ্টা করলেই মা অথবা দিদুনের কাছ থেকে সংযত করার জন্যে এই কথাটাই আসতো, "আস্তে! এমনভাবে অস্থির হলে কিন্তু এই যে সিংহ চলে যাচ্ছে, আর আসবেনা। তখন কী হবে?" অকারণেই স্থির হয়ে যেতাম। ছোটবেলার অবুঝ মনে তখন দাগ কাটতো কথাটা। কষ্ট হতো, কান্না পেত। পুজো তো প্রতিবছর হতেই থাকবে চিরন্তনভাবে! কিন্তু সেই আদরের সাবধানবাণীর প্রতি এমন এক অদ্ভূত বিশ্বাস জন্মে গিয়েছিল যে শোনার পর আর তাড়াহুড়ো করতামনা শোভাযাত্রা দেখার জন্যে। আজ জিজ্ঞেস করলে মা বা দিদুন, কারও পক্ষেই মনে রাখা হয়তো সম্ভব নয় এই ছোট্ট অথচ রঙীন মুহূর্তগুলো। মনে নেইও আমি নিশ্চিত। কিন্তু ছোটবেলায় শোনা সেই ক'টা কথা, "অস্থির হলে কিন্তু এই যে সিংহ চলে যাচ্ছে, আর আসবেনা।" যা শুধু চুপ করে শান্ত হয়ে বসে যাতে দেখি সেই জন্যেই বলা হতো, তা মনে করলে হাসিও পায় একটা অনাবিল নির্মল আনন্দে, আবার চাপা কান্নাও অনুভব করি- একটা কষ্ট কোথাও আটকে আছে যেন! এতটাই গভীর বিশ্বাস ছিল কথাগুলোর প্রতি। 

  এরপর আরও কত ছোটবড়, ভালোমন্দ ঘটনার ধারা-উপধারা বয়ে গেছে জীবন প্রবাহে। ছোটবেলার ও কিশোরবেলার পুজো দেখা হয়ে উঠলো পুজোর কভারেজ তৈরি করা – স্থানভিত্তিক ও বার্ষিকভাবে। ২০১৫ থেকে আর্কাইভ তার নাম পেল- 'দশদিকে দশভুজা'। আজ সত্যি বলতে খুব ভালো লাগে একপেশে একটা বিচারের দৃষ্টিকোণ থেকে যে রূপদানের যে মুহূর্তগুলো তমলুক-ঘাটাল সেন্ট্রাল কো-অপারেটিভ ব্যাঙ্কের বা তাম্রলিপ্ত এডুকেশন্যাল হোমে পড়ার দরুণ আবাসবাড়ি ফ্রেণ্ডস্ ইউনিয়নের (তমলুকের প্রথম সার্বজনীন পুজো) প্রতিমার গড়ে ওঠা দেখে উপভোগ করতাম সেই সময়ে, তা এখন উত্তরণের পথ পেয়েছে 'দশদিকে দশভুজা'-র আর্কাইভে। টু মেগাপিক্সেলের এবং তারপরে ক্যানন ইক্সাস ১৭০-র পয়েন্ট অ্যাণ্ড শ্যুট্ ক্যামেরার হাত ধরে এখন নিকন ডি৩১০০-র সাহচর্যে যথাসম্ভব নিপুণভাবে লেন্সবন্দী মুহূর্তেরা গ্যালারিতে জ্বলজ্বল করে! রয়েছে ক্ষুদিরাম জেঠুর সাথে প্রতিবছরের নিত্য দেখাসাক্ষাৎ, সংযোজন হয়েছে তরুণদার (তরুণ বেরা, নন্দকুমার) মতো উদীয়মান শিল্পীর কাজের সম্ভারের, যিনি একাধারে একজন প্রতিমা শিল্পী ও একজন কীর্তন শিল্পী। সুযোগ এসেছে এখনকার সমসাময়িক ও প্রথিতযশা শিল্পীদের কাজ ভার্চুয়াল মিডিয়ার সৌজন্যে শুরু থেকে শেষ অবধি দেখার। সংগ্রহে এসেছে তিরিশজন শিল্পীর প্রায় পাঁচশোরও বেশি কাজের ছবি! তবুও মনের অন্দরে আজও অনাবিল আনন্দে খেলা করে সেইসব পুরোনো স্মৃতিরা, যাদের কিছু মুহূর্তের কথা আজ ভাগ করে নিলাম। যতই সংগ্রহভাণ্ডার বাড়ুক না কেন, এই স্মৃতিরা সুখে বাঁচুক সারাটা জীবন ধরে। এখন তো এদেরই হাতড়ে বেড়াই অবসরে! কভারেজের চাপে কমেছে মনের বিশ্রামের সময়। সাবেকীয়ানায় ভাটার টানকেই বা আর কীকরে অস্বীকার করি? তবুও এই সময়টা তো শুধু মহামারীর সময় নয়, বেশ কিছুটা আশাবাদ নিয়ে একে এক পুনর্জাগরণের পর্ব হিসেবে অভিহিত করলেই বা ভুল কোথায়? পুজো তো প্রায় এসেই গেল। সময় এলো শিল্পীদের – মৃৎ-পূজারীদের ঘরে উমার সেজে ওঠার মুহূর্ত সঞ্চয়নের। ভালো থাকার ও ভালো রাখার অঙ্গীকার আর সুমহান প্রার্থনার সিঞ্চন শুরু হোক মাটির মানুষগুলোর হাত ধরেই।

No comments:

Post a Comment